
[প্রবন্ধটি ১৯৭১ সালে/১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র-আশ্বিন ত্রৈমাসিক ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কমরেড মণি সিংহের বয়স তখন সত্তর। বানানরীতি পরিবর্তন করা হয়নি]
[বাঙলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মণি সিং এমনই একটি নাম যা প্রায় মন্ত্রের মতো কাজ করে। সত্তরের উপর বয়েস। আকৈশোর রাজনীতি করছেন। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পথে আসেন। অবিভক্ত বাঙলাদেশে শ্রমিক আন্দোলন যাঁরা শুরু করেছিলেন, মণি সিং তাঁদেরই একজন। তারপর তিনি কৃষক আন্দোলন শুরু করলেন মৈমনসিং জেলায়। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত টংকবিরোধী আন্দোলন তো আজ ইতিহাস। দেশভাগের পর, পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকে, তিনি ছিলেন কমরেডদের ‘বড় ভাই’। আজও তাই।
অল্প বয়েস থেকেই বৃটিশ ও পাকিস্থান সরকারের কারাগারে তাঁর দীর্ঘ জীবন কেটেছে। আত্ম-গোপন অবস্থায় আরও বৃহৎ অংশ।
পূর্ব পাকিস্থানে (বর্তমান বাঙলাদেশ) হাজংদের সশস্ত্র সংগ্রামের নায়ক এই মানুষটিকে আয়ুব আমলে তাঁর দেশবাসী জেল ভেঙ্গে ছিনিয়ে আনে। ইয়াহিয়া আবার তাঁকে বন্দী করলেও ২৫ এ র্মাচের পর স্বাধীন বাঙলাদেশের রাজশাহী জেল থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন।
তারপর নতুন ইতিহাস। আজও তার নির্মাণ চলছে। এবং এখনও তিনি তার সঙ্গে একইভাবে যুক্ত।
সম্প্রতি গঠিত বাঙলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা-পরিষদে তিনি বাঙলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিনিধি। আর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক।
এখনকার অসম্ভব ব্যস্ত দিনগুলোর মধ্যেও কয়েকদিন র্দীঘ সময় ধরে তাঁর বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর জীবনের নান অভিজ্ঞতা শোনার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়। তারই একটা অংশ এখানে লিপিবদ্ধ হলো।
প্রসঙ্গত ‘বড় ভাই’ বলেছিলেনঃ এইটা আমার লাইফের একটা মূল ঘটনা। সমস্ত ঘটনা যদি তুচ্ছ করে দেনও- আমার কাছে আমার নিজের জীবন গড়ে ওঠার ব্যাপারে এই ঘটনার গুরুত্ব কতখানি তা আমি জানি। আমি পরিবারের প্রিয়জন ছিলাম। মাকে চিরকালই অসম্ভব ভালোবাসতাম। কিন্তু তা সত্বেও একক সিদ্ধান্তে আমি মেটিয়াবুরুজ ছেড়ে সুসং-দুর্গাপুরে থেকে টংক-বিরোধী আন্দোলন শুরু করি।
আমরা জানি এই আন্দোলন এবং ৪৯-৫০ সালের হাজং সশস্ত্র সংগ্রাম বাঙলাদেশের ইতিহাসে কতবড় ঘটনা।
ঢাকা জেলে সাজা খাটার পর সম্ভবত ১৯৩৬ সালে আমাকে নদীয়া জেলার করিমপুরে অস্তরীণ করা হয়।
এগারোশো ডেটিনিউকে লিস্টি করে ছাড় দেওয়া হয়। আমিও খালাস হই। চুয়াডাঙ্গা স্টেশন থেকে মুক্তি পেয়ে কলকাতা এলাম। সেন্ট্রাল এ্যাভিনিউতে কৃষক-সভার অফিস। গেলাম সেখানে, কিন্তু নেতৃস্থানীয় কারোরই দেখা পেলাম না। আমার কাছে রেলওয়ে ওয়ারেন্ট ছিল। দেরি করলে সেটি বাতিল হয়ে যাবে। তাই ভাবলাম, যাই, এই সুযোগে একটু মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি। সাত দিন পর ফিরব।
আমি সুসং চলে গেলাম। সেটা ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাস।
আমি এসেছি শুনে দশাল গ্রামের পাঁচ-ছয়জন মুসলমান কৃষক দেখা করতে এলো। তারা বলল, ছাড়া পাইসেন যে খুব ভালো হইসে। এ্যাহন এট্টু টংক নিয়া লাগেন। আপনেই তো কইসিলেন কৃষকরা এক হইলে টংক রদ সম্ভব। এ্যাহন আন্দোলন কইর্যা আমাগো বাঁচান। আমরা হগগলডি মইরা আছি।
আমি বলি ঃ আমি কলকাতায় শ্রমিক আন্দোলন করি, সেখানে আমায় ফিরতে হবে। কাজের একটা লাইন আছে তো! আমি কি করে এখানে টংক আন্দোলন করব? এসেছি মায়ের সাথে দেখা করতে, দুটো দিন থেকে আবার চলে যাব।
একটু মনঃক্ষুণ্ন হয়ে তারা ফিরে যায়। কিন্তু প্রত্যেক দিন পাঁচ-সাত জন করে কৃষক এসে বলতে থাকে- আমি দেশের ছাওয়াল। আমি যেন একটা আন্দোলন শুরু করি।
চার-পাঁচ দিন এইভাবে চলল। ফিরিয়ে দিচ্ছি, ব্যাপারটা খারাপ লাগে, আবার শ্রমিক আন্দোলনও হাতছানি দিচ্ছে। সে এক মহা দোটানা!
একদিন রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম- আমি কি প্রকৃতই এদের ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টর স্বার্থে ফিরিয়ে দিচ্ছি, নাকি, আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সকলের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হবে এই ভয়ে গোটা ব্যাপারটাই এড়িয়ে যেতে চাইছি?
বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ, বৃটিশ পুঁজি, মারোয়াড়ী পুঁজি.. এ সবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কিন্তু তাতে তো আমার নিজের কোনো ক্ষতি ছিল না। এইখানে আন্দোলন মানেই নিজের বিরুদ্ধে নিজের আন্দোলন। আমার পরিবারকে ঘায়েল করা।
হঠাৎ মনে হলো আমি যদি প্রকৃতই মার্কসবাদ-লেনিনবাদী হই তাহলে আমার আসল কর্মক্ষেত্র হবে মেটিয়াবুরুজ নয়, এইখানে।
আমি বুঝলাম এই আমার মহাপরীক্ষাস্থল।
সুসং-দুর্গাপুরে আলোচনা করার মতো কেউ নেই। দাদাদের সঙ্গেও আলোচনা করে লাভ নেই। বুঝলাম সিদ্ধান্তটা আমাকে একক ভাবেই নিতে হবে।
দু-একদিনের মধ্যেই মনস্থির করে ফেললাম। আমাকে এই মহাপরীক্ষাই দিতে হবে।
মুণি সিং সোজা হয়ে বসলেন। হাসি মুখে, কিছুটা তন্ময় অথচ দীপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর কৌটা থেকে তামাক পাতা বের করে বাঁ হাতের তালুতে রেখে ডান হাতের বুড়ো আঙুল ঘসে ঘসে খৈনি বানাতে বানাতে বললেনঃ কলকাতার শ্রমিক আন্দোলন করার লোক পাওয়া যাবে। কিন্তু এখানে আন্দোলনের জন্য চাই স্থানীয় লোক। যেহেতু আমি রাজনীতিক ও স্থানীয় লোক সেহেতু এ আন্দোলন আমাকেই করতে হবে। কৃষকরাও আমাকেই বিশ্বাস করবে। কারণ আমি একজন কমিউনিস্ট।
বাঁ হাতের তালুর ওপর ডান হাতে কটা কৌশলী চাপড় মেরে খৈনি বানানো শেষ হলো। এক টিপ খৈনি মুখে পুরে বলতে লাগলেনঃ আত্মীয় পরিজনের বিরুদ্ধে শ্রেণীসংগ্রাম করতে পারলে বুঝব আমি নিজ আর্দশের প্রতি বিশ্বস্ত। এটা পশ্চাদপদ অঞ্চল। শহর ছেড়ে কারখানা ছেড়ে এখানে পড়ে থাকতে পারলে বুঝব দেশপ্রেমের কথা আমার মুখে সাজে।
তখনও পার্টির এ ধরনের কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। একটা পার্টি আছে, তার নির্দেশে সবকিছু চলছে- এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা আমাদের ওপর তখনও বর্তায় নি। সুতরাং স্থির করলাম নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই কাজ শুরু করে দেবো।
স্থির তো করলাম। কিন্তু করবটা কি?
জমিদার অসম্ভব শক্তিশালী, তায় আত্মীয়। ইতিপূর্বেই আমার সঙ্গে একবার ঘটনা ঘটে গেছে। আরও অনেক আত্মীয়-স্বজন আছেন টংক ধানের ওপর যাঁদের সংসার যাত্রা নির্ভর করে। তাছাড়া আমার নিজের বাড়িও আছে।
টংকবিরোধী আন্দোলন মানে মৌচাকে ঢিল। দাদারা বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। কিন্তু মা? অত্যন্ত কোমলহৃদয়া হওয়া সত্ত্বেও মা দৃঢ়তার সঙ্গে বারবার আমাকে সমর্থন করেছেন। এবার কি হবে? মা কি ঘরে-বাহিরে সকলের চাপ সহ্য করতে পারবেন? যদি কান্নাকাটি শুরু করেন, আমি কি করব তখন?
তাছাড়া, আন্দোলনটা করব কি ভাবে? আমার শ্রমিক আন্দোলনের কিছু অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তো একেবারে নেই!
মুসলিম কৃষকরা আন্দোলন ইত্যাদির ব্যাপারে একেবারেই অনভিজ্ঞ। তাদের জমিদার-ভীতি প্রবল। পুলিশের ভীতি আরও বেশি।
শ্রমিক আন্দোলনে দেখেছি শ্রমিকরাই বহু সময় বলে দিয়েছে কি করতে হবে বা কি বলতে হবে। তাদের উপদেশ বহু সময় আমায় বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এটা শ্রমিক এলাকা নয়। আমি জানি কৃষকরা সব সময় আমার ওপরই নির্ভর করবে। কিন্তু প্রয়োজনে আমি নির্ভর করব কার ওপর?
তাছাড়া পুলিশ পাইক হাতি এলে এরা দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়াতে পারবে কি না তাও জানি না। তাছাড়া নানা স্বার্থ এদের মধ্যে ক্রিয়া করে। কৃষকরা সঙ্কীর্ণবাদীও হয় বটে!
কিন্তু এগুলো যেমন খারাপ দিক, তেমনি আবার গোটা পরিস্থিতির ভালো একটা দিকও আছে।
প্রকৃত ব্যাপারটা হলোঃ কৃষকদের ওপর ভয়ানক শোষণ চলছে। তাই অবস্থার চাপেই তারা আন্দোলনে নামতে চায়।
আন্দোলনের বাস্তব অবস্থা আছে, কৃষকদের সংগ্রাম করার আগ্রহ আছে, অতএব তাদের মধ্যে ঐক্য হওয়াও সম্ভব। আর ঐক্য হলে অনেক দুর্বলতাই কেটে যেতে পারে। কারণ ঐক্যের শক্তির যাদুই হলো সে মানুষকে নির্ভয় করে, বেপরোয়া করে।
কৃষকরা টংকবিরোধী আন্দোলনের কথা ভাবছে- এতে তাদের অর্থনৈতিক চিন্তাই প্রবল। আমার কাছে এটা রাজনৈতিক আন্দোলন, কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে তাদের কোনো চেতনাই নেই। ওরা মনে করে স্বদেশী ভদ্রলোকের ব্যাপার। তাদের এসব নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো।
কিন্তু শ্রমিকরাও তো বাস্তব অবস্থার চাপেই ঐক্যবদ্ধ হয়। তারাও তো অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়েই আন্দোলন শুরু করে। তারপর তাদের মনে ক্রমে ক্রমে রাজনৈতিক চেতনা জাগে। আমি বুঝলাম কৃষকদের ক্ষেত্রও তাইই হবে।
আগেই বলেছি সুসং-এর জমিদার অত্যন্ত শক্তিশালী। এখাানকার মধ্যশ্রেণীও রীতিমতো শোষক। আর এরাই গরীব কৃষকদের বাঁচামরার কর্তা।
কিন্তু ইংরাজ সরকারের প্রশাসন ব্যবস্থার দ্বারা সুরক্ষিত ও এই মধ্যশ্রেণীর সেবা আর সহায়তায় পুষ্ট প্রবল প্রতাপ জমিদারের পুরুষানুক্রমে গড়ে ওঠা প্রকাণ্ড সংগঠনের প্রচণ্ড বাধাকে অতিক্রম করাই তো কমিউনিস্টের কাজ।
বুঝলাম শুরু করতে হবে। কারণ আন্দোলনের বাস্তব অবস্থা এবং আন্দোলনকারীদের ঐক্যের সম্ভবনা- যে কোনো সংগ্রামের এই দুটি প্রথম আর প্রধান শর্তই এখানে উপস্থিত!
তখন, আন্দোলনের রুপটা কি হবে তাই নিয়ে ভাবনা শুরু হলো। আন্দোলনটা যদি খাজনা বন্ধ করার হয় তাহলে জমিদারপক্ষ সরকারী সাহায্যে অত্যাচারের বন্যা বইয়ে অতীতের মতো সহজেই তা দমিয়ে দেবে। শুরু হলো কৌশল নিয়ে চিন্তা। না, শুধু সভা-সমিতির বক্তৃতা নয়। কৃষকের ঘরে ঘরে সেধোতে হবে। তাদের দিয়ে বলাতে হবে- খাজনা আমরা দেব, তবে ধানে নয় টাকায়।
এখন নভেম্বর মাস। জমিদারের লোকেরা ধান নিতে বেরোবে জানুয়ারী মাসে। তারা যে কোন ভাবে ধান নিয়ে ফিরবে। সুতরাং অবিলম্বে “ধান বন্ধ, টাকায় খাজনা” স্লোগান সহ বেরিয়ে পড়তে হবে।
আন্দোলনের এই ফর্মটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খুঁজে পেলাম। কিন্তু খুঁজে তো পেলাম আমি। এখন, কৃষকদের ওপর এই স্লোগানের প্রতিক্রিয়া কি হয় তাও তো দেখতে হবে!
স্থির করলাম কাল থেকে নেমে পড়ব।
এইভাবে, বাড়ি যাওয়ার দু-চার দিনের মধ্যে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বুঝলাম দেরি করলে অবস্থা হাত ফসকে যাবে, জনসাধারণ ডিফেন্সিভেই পড়বে, তাদের কিন্তু অফেন্সিভেই রাখতে হবে।
তাছাড়া এত ভয়েরই বা কী আছে?
শ্রমিক আন্দোলনেও তো দেখছি গোড়ার দিকে শ্রমিদের মধ্যে চূড়ান্ত হতাশা থাকে। তারা কথায় কথায় বলে ঃ উওতো বহোৎ দিখা, কুছ নেহি হোগা।
কমিউনিস্ট মতাদর্শে দৃঢ়ভাবে বিপ্লবী না হলে শ্রমিকদের এই সংশয় আর অবিশ্বাস দেখে বহু কর্মীই ঘরে বা পার্টি অফিসে ফিরে যেত। আবার দেখা গেছে কোনো ঘটনা ঘটলে ঐ হতাশ শ্রমিকরাই ঐক্যবদ্ধ জঙ্গী সংগ্রাম করে।
সুতরাং বুঝতে পারলাম কৃষকরাও গোড়ায় যতই ডিমরালাইজড ও দ্বিধাগ্রস্ত হোক, অভিজ্ঞতায় পোড় খেলেই তারা মিলিট্যান্ট আর ঐক্যবদ্ধ লড়াই শুরু করবে।
হ্যাঁ, বাঁধা চূড়ান্ত। ভীমরুলের চালে ঢিল পড়বে। কিন্তু নো রিটার্ন। যত অল্প সঙ্গীই হোক শুরু করতে হবে। এইভাবে মনস্থির করে আত্মবিশ্বাস অর্জনের পর দশাল গ্রামে চলে গেলাম। সেই বৃদ্ধ কৃষককে ডেকে বললাম ঃ টংক আন্দোলনে আমি আপনাদের সহযোগী। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে।
খুবই খুশি হলো বৃদ্ধ। ডাকল সবাইকে। তাদেরও বললাম ঃ আমি আপনাদের সাথী। আপনাদের এগোতে হবে।
তারা বলল ঃ আপনি থাকবেন সামনে। আমরা আপনার পেছনে।
আমি বললাম ঃ আমি কেন সামনে থাকব? টংক উচ্ছেদ হলে আমার কোনো লাভ হবে? বরং ক্ষতি হবে। স্বার্থ তো আপনাদের। সুতরাং আপনাদেরই সামনে থাকতে হবে। আমি দেশসেবক। স্বাধীনতা চাই, কৃষকদের মঙ্গল চাই। আর্দশের কারণে আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব।
কিন্তু তারা বুঝল না। বলল ঃ সামনে আপনি থাকবেন। আমাদের কি করতে হবে বলেন।
বুঝলাম অচেতন কৃষকদের এখন এ কথা বোঝানো যাবে না, বোঝাতে গেলে বৃথাই সময় নষ্ট হবে। যেমন ঃ করতে হবে একতা, জোট বাঁধা।
তারা বলল ঃ এক হব? ব্যাঙকে আপনি পাল্লায় মাপতে পারবেন? একটা এদিক ছিটকোবে একটা ওদিকে ছিটকোবে। আমাদের হবে সেই অবস্থা। ঐক্য ঠিক হবে না।
আমি বললাম ঃ আচ্ছা, এই যেসব কৃষক আছে- তারা কি টংক উচ্ছেদ চায়?
-কি যে কন! ব্যাবাক চায়।
-তা অইলে টংক উচ্ছেদের স্বার্থে হগলের ডুলে ভইরা পাল্লায় তোলেন। দ্যাখবেন কেউ ছিটকাইতে পারব না। টংক উচ্ছেদ হইল ডুল।
শুনে সবাই খুশি হয়ে গেল।
-দ্বিতীয় কথা হইল ঃ এক গোটা টংক ধান কেউ দিতে পারবা না। শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে রহল।
কইতে অইব খাজনা আমরা দিমু না, তা না। জোতদারের যে হার আছে- এক আরা জমিতে ৫ টাকা থিকা ৭ টাকা -আমরা সেই হারে টাকায় খাজনা দিমু।
তখন দুই থেকে সোয়া দুই টাকা ধানের মণ। চুক্তি মতো কৃষকদের এক আরা (সোয়া একর) জমিতে আট থেকে পনের মণ ধান দিতে হতো। অর্থাৎ সোয়া একরের পাঁচ থেকে সাত টাকা খাজনার জায়গায় দিতে হতো অন্তত ষোল টাকা। টংক কৃষকদের শোষণের পরিমাণটা এর থেকেই বোঝা যাবে।
অল্পদিনের মধ্যেই টংক আন্দোলনটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ কৃষকদের মধ্যে আমি প্রথমে যতটুকু আশা করেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি প্রভাব সৃষ্টি হলো।
আন্দোলন পথম শুরু হলো আমারা বাড়ির কাছে সুসং-দুর্গাপুর দশাল গ্রাম থেকে। মুসলিম কৃষকরা- তাদের টংক রেট ও বেশি ছিল- ব্যাপক ভাবে আন্দোলনে সাড়া দিল। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সুসং-এর উত্তর দিকে অর্থাৎ পাহাড়ের কোল ঘেসে যে উপজাতি এলাকা ছিল, সেখানেও গিয়ে উপস্থিত হলাম। প্রথমে আমি ললিত সরকারের বাড়িতে গেলাম। সেটা লেঙ্গুড়া গ্রাম। আমাদের গ্রাম থেকে সাত মাইল দূরে।
ললিত সরকারের বাড়িতে যাওয়ার কারণ হলো আমি শুনলাম ১৯৩০ সালে সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স আন্দোলনের সময় ললিত সরকারের নেতৃত্ত্বে এখানে একটি কংগ্রেস অফিস খোলা হয়েছিল। এবং তারা এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। পুলিশ থেকে সেই অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
ললিত সরকারের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার পরিচয় পেয়ে আমি তার কাছে গিয়ে উপস্থিত হই। ললিত সরকার একজন ধনী কৃষকের সন্তান। তার প্রচুর জমি ছিল, কিন্তু কোনো টংক জমি ছিল না। কিন্তু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ললিত সরকার টংকপীড়িত কৃষকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জঘন্য বর্বর টংকপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য এগিয়ে এলেন। প্রকৃতপক্ষে ললিত সরকারকে ভিত্তি করেই পাঁহাড় অঞ্চলে হাজং, ডালু, কোচ, বানাই প্রভৃতি উপজাতিদের মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।ভভ
পাহাড় অঞ্চলে উপজাতি-এলাকায় টংক হার কম ছিল। মুসলিম এলাকায় টংকর হার ছিল অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও হাজংরা অনেক তাড়াতাড়ি এই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করল। এই সব হাজং কৃষকেরা যেমন অর্থনীতিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হলো, তেমনি একটা দেশপ্রেমিক কাজ বলেও এটাকে গ্রহণ করল। যাদের মোটেই টংক জমি ছিল না এরকম মধ্য ও গরীব কৃষকও এই আন্দোলনে যোগদান করে সংগ্রামকে দুর্বার করে তুলল।
এই আন্দোলনের শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমিদারবর্গ, মহাজন, মধ্যবিত্ত সমাজ প্রভৃতি আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। পূর্বে যেটাকে ভিমরুলের চাকে ঢিল বলে মনে করেছিলাম, এখন দেখলাম ব্যাপার এর থেকেও অনেক বেশি গুরুতর। চারদিক থেকে শুরু হলো প্রচণ্ড আক্রমণ।
দাদারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। অবশ্য তাঁরা নিজেরা আমাকে কটুকথা বললেন না। মাকে দিয়ে আমাকে প্রভাবান্বিত করবার চেষ্ট করলেন। মা একদিন আমাকে বললেন, এই যে আত্মীয়-স্বজনের লগে তুমি বিরুদ্ধাচরণ করতাস- এইটা কি ভাল হইতাসে?
আমি মাকে কোনো শ্রেণীসংগ্রাম বোঝাবার চেষ্টা করলাম না। কারণ তিনি যেভাবে মানুষ হয়েছেন তাতে তাঁর এই পরিণত বয়সে তাঁকে শ্রেণীসংগ্রাম বোঝানোর চেষ্টা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা মাত্র। আমি তাকে শুধু এই কথাই বললাম ঃ তুমিই তো আমাদের শিখিয়েছিলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়, যারা গরীব তাদের সাহায্য করতে হয়। শিখিয়েছিলে নরই হচ্ছে নারায়ণ, যত্র জীব তত্র শিব। আমি তো সেই নরনারায়ণকেই সাহায্য করছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তোমার শিক্ষাই আমার জীবনের আর্দশ। সেইভাবেই আমি আন্দোলন শুরু করেছি। এত সহস্র লোকের যদি উপকার হয় তাহলে সেইটেই করা কি বাঞ্চনীয় নয়?
মা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটি প্রতিবাদও করলেন না। সেদিন কোনো বাধাকেই আমি আমল দিইনি। একটিমাত্র সম্ভাব্য বাধাকেই আমার প্রবল মনে হতো। মা যদি বাধা দেন তাহলেই তো মুশকিল। কিন্তু এর পরে এ ব্যাপারে মা আর কোনদিন কোনো বাধা দেন নি। আমার জন্য তাঁর অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মনে মনে সন্তুষ্ট না হলেও তিনি আমাকে কিচ্ছু বলেন নি।
যে বাধাকে আমি বিরাট ভেবেছিলাম, এইভাবে অল্পআয়াসেই তা অতিক্রম করা গেল। আমার সামনে আর কোন বাধাই থাকল না।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘কালান্তর’ ও ত্রৈমাসিক ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন।